স্বাস্থ্য টিপস

বিড়ালের আঁচড়ে কি ভ্যাকসিন দিতে হয় | ৭টি সহজ সমাধান জানুন

বিড়ালের আঁচড়ে কি ভ্যাকসিন দিতে হয়? বিড়ালের আঁচড় অনেকের কাছেই সাধারণ একটি ব্যাপার মনে হতে পারে, কিন্তু এটি কি সত্যিই অবহেলা করার মতো? অনেকে জানেন না যে, এই ছোট্ট আঁচড় থেকেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই প্রশ্ন ওঠে বিড়ালের আঁচড়ে কি ভ্যাকসিন দিতে হয়? সঠিক তথ্য জানা জরুরি, কারণ একটুখানি অসতর্কতা ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। আজ আমরা এই বিষয়টি নিয়ে গবেষমধর্মী বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য নিয়ে  আলোচনা করবো, যাতে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন, বিড়ালের আঁচড়ের পর আসলেই কী করা উচিত!

বিড়াল আঁচড় দিলে কি কোনো সমস্যা হয়?

বিড়ালের আঁচড় সাধারণ মনে হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি বিপজ্জনক হতে পারে। বিড়ালের নখে থাকা ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস ক্ষতস্থানে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। বিশেষ করে Bartonella henselae ব্যাকটেরিয়ার কারণে ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ (CSD) হতে পারে, যা জ্বর, লিম্ফনোড ফুলে যাওয়া ও ক্লান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া, টক্সোপ্লাজমোসিস বা রেবিসের ঝুঁকিও থেকে যায়, বিশেষত যদি বিড়ালটি আগে থেকেই সংক্রমিত থাকে। আঁচড় লাগলে ক্ষতস্থান সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার করা, অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করা এবং জটিলতা দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সুতরাং, সচেতনতা ও সতর্কতা অবলম্বন করাই শ্রেয়।

বিড়াল আঁচড় দিলে কি ভ্যাকসিন দিতে হবে?

বিড়ালের আঁচড়ে কি ভ্যাকসিন দিতে হয় কিনা সেই বেপারে আপনাকে বিস্তারিত জানাব। আশা করি এই তথ্য টুকু পুরো মন দিয়ে পড়লে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন যে আপনার ভ্যাকসিন নিতে হবে কিনা।

১. ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ (CSD): Bartonella henselae ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হতে পারে, যা জ্বর, লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি সৃষ্টি করতে পারে। 2. জলাতঙ্ক (Rabies): বিড়াল যদি জলাতঙ্ক ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়, তাহলে আঁচড়ের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটতে পারে। 3. টেটানাস: যদি আঁচড় গভীর হয় এবং সময়মতো যত্ন না নেওয়া হয়, তবে টেটানাস ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকে। 4. সাধারণ ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ: বিড়ালের নখে বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা চামড়ার ক্ষতস্থানে প্রবেশ করে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

বিড়ালের আঁচড়ে কি ভ্যাকসিন দিতে হয়
 

আরো পড়ুন: হাটুর ব্যাথা সারানোর ঘরোয়া উপায় | সেরা ৭ টি উপায় জানুন

জীবাণুর সংস্পর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা

বিড়ালের আঁচড় কতটা গুরুতর এবং এর জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত তা নির্ভর করে সংক্রমণের ঝুঁকির ওপর।

  • ক্যাটাগরি ১: যদি বিড়াল শুধু চামড়ায় লেহন করে বা হালকা স্পর্শ করে, তবে কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।
  • ক্যাটাগরি ২: যদি বিড়াল আঁচড় দেয়, তবে ক্ষতস্থানে যত্ন নেওয়া ও জলাতঙ্ক টিকা নেওয়া দরকার।
  • ক্যাটাগরি ৩: যদি আঁচড় চামড়া ভেদ করে রক্তপাত ঘটায়, মুখমণ্ডল বা মেরুদণ্ডের কাছে আঁচড় লাগে, তবে টিকার পাশাপাশি ইমিউনোগ্লোবিন ইনজেকশন নেওয়া জরুরি।

বিড়াল আঁচড় দিলে করণীয় কি (চামড়ার যত্নে করণীয়)

  1. ক্ষতস্থান দ্রুত তীব্র জলের ঝাঁপটায় ধুয়ে ফেলুন।
  2. সাবান ও জীবাণুনাশক ব্যবহার করুন।
  3. যদি ক্ষত গভীর হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  4. বিড়ালের আঁচড়ে জলাতঙ্কের আশঙ্কা থাকলে টিকা নিতে হবে।

টিকা ও চিকিৎসা

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে দুটি ধরনের টিকা রয়েছে—একটি মাংসপেশিতে (IM) এবং অন্যটি চামড়ার নিচে (ID) দেওয়া হয়। সাধারণত মাংসপেশির টিকাই বেশি প্রচলিত।

  • যদি আগে টিকা নেওয়া না থাকে: ০ (কামড় বা আঁচড়ের দিন), ৩, ৭, ১৪ ও ২৮তম দিনে টিকা নিতে হবে।
  • পাঁচ বছরের মধ্যে টিকা নেওয়া থাকলে: শুধু ০ ও ৩য় দিনে বুস্টার ডোজ নিলেই হবে।
  • যদি ইমিউনোগ্লোবিন ইনজেকশন না পাওয়া যায়: ০তম দিনে দুই বাহুতে ২টি টিকা, এরপর ৩, ৭, ১৪ ও ২৮তম দিনে টিকা পূর্ণ করতে হবে।
  • গৃহপালিত বিড়াল যদি ১০ দিন সুস্থ থাকে: তবে ১৪ ও ২৮তম দিনের টিকা নাও লাগতে পারে।

আরো পড়ুন: ছেলেদের জন্য অশ্বগন্ধার উপকারিতা | অশ্বগন্ধা খেলে কি লম্বা হয়

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সচেতনতা জরুরি

জলাতঙ্ক একটি প্রাণঘাতী রোগ, যা একবার লক্ষণ দেখা দিলে নিরাময় সম্ভব নয়। তাই প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রেও জলাতঙ্ক টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ। তাই যদি কখনো বিড়ালের আঁচড় লাগে, তাহলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বাচ্চা বিড়াল কামড়ালে কি ভ্যাকসিন দিতে হয়

বাচ্চা বিড়াল কামড়ালে সাধারণত ভ্যাকসিন নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে যদি বিড়ালটির জলাতঙ্ক টিকা দেওয়া না হয়ে থাকে। যদিও গৃহপালিত ও সুস্থ বাচ্চা বিড়ালের কামড়ের ঝুঁকি তুলনামূলক কম, তবুও জলাতঙ্ক (Rabies) সংক্রমণের সম্ভাবনা এড়াতে সতর্কতা জরুরি। কামড় যদি চামড়া ভেদ করে রক্তপাত ঘটায়, তাহলে ক্ষতস্থান দ্রুত সাবান ও জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। যদি বিড়ালটি অজ্ঞাত বা সন্দেহজনক হয়, তাহলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ০, ৩, ৭, ১৪ ও ২৮তম দিনে ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত। এছাড়া, যদি গত পাঁচ বছরের মধ্যে জলাতঙ্ক টিকা নেওয়া থাকে, তবে শুধু ০ ও ৩য় দিনে বুস্টার ডোজ নেওয়াই যথেষ্ট।

আমার শেষ পরামর্শ

বিড়ালের আঁচড়ে কি ভ্যাকসিন দিতে হয়? বিড়ালের আঁচড় বা কামড় আপাতদৃষ্টিতে তেমন ক্ষতিকর মনে না হলেও, এটি কখনো কখনো গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে জলাতঙ্ক, ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ বা টেটানাসের মতো সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সঠিক পরিচর্যা, দ্রুত জীবাণুমুক্তকরণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। তাই বিড়ালের আঁচড় বা কামড়কে অবহেলা না করে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজনে ভ্যাকসিন নেওয়া সর্বদাই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখা জরুরি, প্রতিরোধই একমাত্র নিরাপদ সমাধান, কারণ একবার সংক্রমণ হলে তার ক্ষতি অপূরণীয় হতে পারে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতন হোন, নিরাপদ থাকুন!

বিড়ালের আঁচড়ে কি ভ্যাকসিন দিতে হয় এই সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে সচেতন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি জলাতঙ্কসহ অন্যান্য সংক্রমণ ছড়াতে পারে। নিচে এই বিষয়ে সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও তাদের উত্তর প্রদান করা হলো:

প্রশ্ন ১: বিড়াল আঁচড় দিলে কত দিনের মধ্যে টিকা দিতে হয়?

উত্তর: বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের পর যদি রক্তপাত হয়, তাহলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে, বিশেষ করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, জলাতঙ্কের টিকা নেওয়া উচিত। রক্তপাত না হলে এবং আঁচড়টি ত্বকের উপরেই সীমাবদ্ধ থাকলে, সাধারণত টিকার প্রয়োজন হয় না। তবে, সঠিক পরামর্শের জন্য চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। 

প্রশ্ন ২: বিড়ালের আঁচড় কি ক্ষতিকর?

উত্তর: বিড়ালের আঁচড় ত্বকের গভীরতা অনুযায়ী ক্ষতিকর হতে পারে। রক্তপাত হওয়া আঁচড়ের মাধ্যমে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে, যা জলাতঙ্কসহ অন্যান্য সংক্রমণ ঘটাতে পারে। রক্তপাত না হলে ঝুঁকি কম, তবে সতর্ক থাকা উচিত।

প্রশ্ন ৩: বিড়ালের আঁচড়ের জন্য কোন ইনজেকশন ব্যবহার করা হয়?

উত্তর: রক্তপাত হওয়া বিড়ালের আঁচড়ের ক্ষেত্রে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ‘অ্যান্টি-রেবিস ভ্যাকসিন’ (Anti-Rabies Vaccine) ইনজেকশন দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ‘রেবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন’ (Rabies Immunoglobulin) ইনজেকশনও দেওয়া হতে পারে।

প্রশ্ন ৪: বিড়ালের আঁচড়ে ভ্যাকসিনের দাম কত?

উত্তর: বাংলাদেশে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিনের দাম বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত, প্রতি ডোজের মূল্য ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে, সঠিক মূল্য জানার জন্য স্থানীয় হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

প্রশ্ন ৫: বিড়াল আঁচড় দিলে কি জলাতঙ্ক টিকা নেওয়া উচিত?

উত্তর: রক্তপাত হওয়া বিড়ালের আঁচড়ের ক্ষেত্রে জলাতঙ্ক টিকা নেওয়া উচিত। রক্তপাত না হলে সাধারণত টিকার প্রয়োজন হয় না, তবে নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

প্রশ্ন ৬: রেবিস ভ্যাকসিনের দাম কত?

উত্তর: রেবিস ভ্যাকসিনের দাম প্রতিষ্ঠান ও স্থানের ভিত্তিতে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত, প্রতি ডোজের মূল্য ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে হতে পারে। সঠিক মূল্য জানার জন্য স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

প্রশ্ন ৭: জলাতঙ্কে আক্রান্ত বিড়াল কতদিন বাঁচে?

উত্তর: জলাতঙ্কে আক্রান্ত বিড়াল সাধারণত ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ করে এবং লক্ষণ প্রকাশের পর কয়েক দিনের মধ্যেই মারা যায়। তবে, সংক্রমণের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে ৫ দিন থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

প্রশ্ন ৮: বিড়াল আঁচড় দিলে কি ইনজেকশন দিতে হয়?

উত্তর: রক্তপাত হওয়া বিড়ালের আঁচড়ের ক্ষেত্রে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ইনজেকশন নেওয়া উচিত। রক্তপাত না হলে সাধারণত ইনজেকশনের প্রয়োজন হয় না, তবে নিশ্চিত হতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

সর্বদা মনে রাখবেন, বিড়াল বা অন্য কোনো প্রাণীর আঁচড় বা কামড়ের পর দ্রুত ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
x