ইসলাম

তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল- জেনে নিন বিস্তারিত

তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল? ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ

ভূমিকা

তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল? রমজান মাস ইসলাম ধর্মের অন্যতম পবিত্র মাস। এই মাসে মুসলমানরা রোজা রাখার পাশাপাশি বিশেষ কিছু ইবাদত করে, যার মধ্যে তারাবির নামাজ অন্যতম। কিন্তু অনেকের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে—তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল। আজকে আমরা এ বিষয়ে কুরআন ও ইসলামের নির্ভরযোগ্য হাদিসের আলোকে জানার চেষ্টা করবো। 

তারাবির নামাজের পরিচয়

তারাবির নামাজ হল রমজান মাসের বিশেষ নামাজ, যা এশার নামাজের পর জামাতে আদায় করা হয়। এটি সাধারণত ২০ রাকাত পড়া হয়, তবে অনেকে ৮ রাকাতও পড়ে থাকেন। নবী (সা.)-এর সময় থেকে সাহাবারা এটি আদায় করে আসছেন, এবং এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে পরিগণিত।

আরো পড়ুন: নফল রোজার নিয়ত কখন করতে হয় | নফল রোজার বিস্তারিত জানুন

তারাবির নামাজ: সুন্নত নাকি নফল?

১. সুন্নতে মুআক্কাদা মতামত:

বেশিরভাগ ইসলামি পণ্ডিত এবং চার মাজহাবের (হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি, হানবলি) আলেমদের মতে, তারাবির নামাজ সুন্নতে মুআক্কাদা (অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে পালনীয় সুন্নত)। এটি এমন একটি ইবাদত, যা রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে আদায় করেছেন এবং সাহাবাদের উৎসাহিত করেছেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে তারাবির নামাজ জামাতে আদায় করেছেন, কিন্তু পরে এটি নিয়মিত জামাতে না পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এই ভয়ে যে, এটি উম্মতের জন্য ফরজ না হয়ে যায়। তবে সাহাবারা রাসূল (সা.)-এর দেখানো পথ অনুসরণ করে নিয়মিত জামাতে তারাবি আদায় করতেন।

হাদিসে এসেছে—

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: “যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে ও সওয়াবের নিয়তে রমজানের কিয়াম (তারাবি) আদায় করবে, তার অতীতের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারি: ৩৭, মুসলিম: ৭৫৯)

হজরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে সাহাবিদের মতামতের ভিত্তিতে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ জামাতে আদায় করা হয়, যা পরে ইসলামের মূলধারার অংশ হয়ে যায়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালিক (রহ.), ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সবাই একমত যে, তারাবি সুন্নতে মুআক্কাদা।

২. নফল মতামত:

কিছু আলেমের মতে, যেহেতু তারাবির নামাজ ফরজ বা ওয়াজিব নয়, তাই এটি নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ, কেউ না পড়লে গুনাহগার হবেন না, তবে পড়লে বিশাল সওয়াব পাবেন। তবে ইসলামের মূলধারার ফকিহগণ একে সুন্নতে মুআক্কাদা হিসেবেই গণ্য করেন।

নফল হিসেবে মানা হলে, তারাবি আদায় করলে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যাবে, কিন্তু এটি ছেড়ে দিলে গুনাহ হবে না। হাদিসে এসেছে—

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসে তাহাজ্জুদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন, তবে তিনি একে আবশ্যকীয় বলে বাধ্যতামূলক করেননি। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও নিষ্ঠার সঙ্গে রমজানে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করবে, আল্লাহ তাআলা তার পূর্ববর্তী পাপ মার্জনা করবেন।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২১৯৭)

এছাড়াও, রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনোই তারাবিকে ফরজ বা ওয়াজিব বলেননি, বরং এটি একটি বিশেষ ইবাদত হিসেবে উৎসাহিত করেছেন। তাই কিছু আলেম একে নফল বলে থাকেন।

আরো পড়ুন: আল্লাহুম্মা ফাক্কিহু ফিদ্দিন অর্থ কি | জেনে নিন সঠিক অর্থ

তারাবির নামাজ সুন্নত নাকি নফল

তারাবির নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলত

গুনাহ মাফ হয়: উপরোক্ত হাদিসে এসেছে যে, যারা তারাবির নামাজ পড়ে, তাদের অতীতের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। এটি রমজানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত।

লাইলাতুল কদরের বরকত লাভের সুযোগ: রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর রয়েছে, যা ১,০০০ মাসের চেয়েও উত্তম। তারাবি পড়ার মাধ্যমে আমরা এই রাতের ফজিলত পেতে পারি।

আল্লাহর নৈকট্য লাভ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—“রমজানে যে ইবাদত করে, সে জান্নাত লাভের পথে অগ্রসর হয়।” (তিরমিজি: ৮০৭)

বেশি সওয়াব: হাদিস অনুযায়ী, রমজানে একটি নফল ইবাদত করলে ফরজের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ হয় এবং একটি ফরজ আদায় করলে ৭০ গুণ বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। (ইবনে মাজাহ: ১৬৪১)

সমাজে ঈমানি চেতনা বৃদ্ধি: তারাবির জামাত মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সম্মিলিত ইবাদতের গুরুত্ব বাড়ায়, যা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

উপসংহার

তারাবির নামাজ সুন্নতে মুআক্কাদা, যা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে পড়া উচিত। যদিও এটি ফরজ নয়, তবে রাসূল (সা.) নিজে এটি আদায় করেছেন এবং সাহাবাদের মাধ্যমে প্রচলিত করেছেন। তাই মুসলমানদের উচিত এই বরকতময় ইবাদতে অংশগ্রহণ করা। আল্লাহ আমাদের সকলকে রমজান মাসের তারাবির নামাজ পড়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

পোষ্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
x